পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা সহ্য করা হবে না
বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করে প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন তার তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সবকিছুই সহ্য করা যেতে পারে কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করা কিছুতেই মেনে নেয়া যাবে না। কারণ আমরা রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, সংগ্রাম করে, যুদ্ধ করে পাকিস্তানকে পরাজিত করে এ দেশ স্বাধীন করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করতে দেয়া হবে না। যদি কেউ সে অপচেষ্টা চালায় তাকে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। সোমবার বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শহীদদের স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
Bisk Club
এ হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর ২৪জন নেতাকর্মী নিহত এবং ৫শ’ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে অনেকে চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। অল্পের জন্য শেখ হাসিনা সেদিন বেঁচে গেলেও সমাবেশ স্থলে ট্রাকের কাছে গ্র্রেনেড বিস্ফোরণে তাঁর কানের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের সামনে অস্থায়ী বেদীতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করে ২১ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাকে হুমকি দিয়ে কোন লাভ নেই। আমি একমাত্র আল্লাহর কাছে সেজদা দেই, আর অন্য কারও কাছে মাথা নত করি না। জনগণের আদালতই সবচেয়ে বড় আদালত, জনগণের শক্তিই বড় শক্তি, এটা সবাই মনে
রাখবেন। প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির সব ক্ষমতা কেড়ে নিতে চান অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন বলেই তাঁরা (বিচারপতি) ওই পদে বসতে পেরেছেন। যে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেন, সেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে না বলেই তাঁদের এতো রাগ।
তিনি বলে, দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করা তো উচ্চ আদালতের দায়িত্ব না। সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলাও তো আদালতের কাজ না। প্রধান বিচারপতি সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন নিয়েও কথা বলেছেন। সংসদ সদস্যদের সঙ্গে এসব সংরক্ষিত নারী এমপিরাও তো ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। আর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেন। তাই সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে কথা বলার আগে প্রধান বিচারপতির তো উচিত ছিল তার পদ থেকে সরে যাওয়া। বলতে পারতেন, যেহেতু সংরক্ষিত নারী এমপি ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছেন, তাই আমি এই পদে থাকব না।
প্রধানমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে প্রধান বিচারপতির দেয়া পর্যবেক্ষণের বেশকিছু অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে বিএনপির ফরমায়েশি রিপোর্ট দেয়া বিচারপতি জয়নুল আবেদনের দুর্নীতির তদন্ত দুদক যাতে না করতে পারে সেজন্য প্রধান বিচারপতি চিঠি লিখলেন। কিন্তু তদন্ত করা যাবে না কেন? একজন দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করা তো প্রধান বিচারপতির কাজ নয়। এটা তো সংবিধান পরিপন্থী, সংবিধান লঙ্ঘনের সামিল। গণপরিষদের সদস্যদের করা আইন প্রধান বিচারপতির পছন্দ নয়, ওনার পছন্দ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল’ অডিন্যান্সের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের জারি করা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল! বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতেই কী তাঁর জুডিশিয়াল কাউন্সিল পছন্দ? রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কেড়ে নেয়া এ কোন ধরনের দাবি?
তিনি বলেন, বিএনপি আমলে অনেক বিতর্কিত, দুর্নীতিবাজ, ভুয়া সনদধারীদের বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে উচ্চ আদালতের পবিত্রতা নষ্ট করা হয়েছে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল হলে তো কারোরই বিচার হবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি আইন পাস করতে গেলে অনেক পর্যায় পার হতে হয়। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন পাস করা হয়। আর আদালতে এক খোঁচায় তা বাতিল করে দেয়। এতো সংসদ সদস্য, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা তাঁদের কারোরই কোন জ্ঞান-বুদ্ধি নেই, জ্ঞান- বুদ্ধি আছে শুধু এক বা দু’জনের? অন্য বিচারকরা স্বাধীনভাবে মতামত তুলে ধরতে পেরেছে কিনা, এটা নিয়েও কথা আছে।
ড. কামাল হোসেনের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন একজন আইনজীবী সর্বোচ্চ আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে যে ভাষায় গালিগালাজ করেছেন, তা কোন সভ্য মানুষ করতে পারে না। তারা আদালতকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আলোচনা সভায় অধিকাংশ বক্তাই প্রধান বিচারপতির কড়া সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন।
আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেমন, জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বসার মাইজভান্ডারী, জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল, কথা সাহিত্যিক ও কালের কন্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম।
সভা পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ ও উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন। আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের পরিবার ও আহত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের সার্বিক খোঁজখবর নেন প্রধানমন্ত্রী।
