আমি খুশি। পুলিশ চাইলে সব পারে। তাদের ধন্যবাদ
আজ শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন কামরাঙ্গীরচরের জাকির-মুন্নী দম্পতি। আদরের মেয়ে সুমাইয়া আজ তাদের কোলে ফিরেছে। প্রায় এক মাস অজ্ঞাত স্থানে, অজানা আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেয়ে মেয়ের চোখেমুখেও হাসির ঝিলিক।
মেয়েকে ফিরে পেয়ে সুমাইয়ার বাবা জাকির হোসেনের মুখে সবার প্রতি কৃতজ্ঞতার সূর। বলছেন, ‘আমার মেয়েকে উদ্ধারে পুলিশ, সাংবাদিকসহ সবাই সাহায্য করেছে। আমি খুশি। পুলিশ চাইলে সব পারে। তাদের ধন্যবাদ।’ একই সঙ্গে তিনি সুমাইয়ার অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
মূল ঘটনায় ফিরি। ঘটনা ২ এপ্রিলের বিকালের। সুমাইয়ার মা মুন্নী বাসায় আসরের নামাজ পড়ছিলেন। বাসার সামনে বাইরে অন্যদিনের মতো খেলছিল পাঁচ বছরের সুমাইয়া। মিনিট বিশেক পর মা ঘর থেকে বের হয়ে দেখেন সুমাইয়া সেখানে নেই। তারপর গোটা এলাকা তন্ন তন্ন করে খোঁজে সবাই। কিন্তু খোঁজ মেলেনি।
ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন না স্টিল কারখানার কর্মচারী সুমাইয়ার বাবা জাকির হোসেন। স্ত্রীর টেলিফোনে দ্রুত বাসায় ছুটে এসে নেমে পড়েন মেয়ের সন্ধানে। কোনো কূলকিনারা না পেয়ে শুরু করেন মাইকিং। গোটা এলাকায় মাইকিং করেও মেয়ের কোনো খোঁজ পাননি।
পরে মেয়ের সন্ধান পেতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হন। ছুটে যান কামরাঙ্গীরচর থানায়। মেয়ে হারানোর কথা বলে প্রথমে সাধারণ ডায়েরি করেন।
তার অভিযোগ, পুলিশের পক্ষ থেকে শুরুতে তেমন কোনো সাড়া পাননি তিনি। কিন্তু বুকের ধনকে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত তো দিশেহারা জাকির হোসেন। আবার কামরাঙ্গীরচরে মেয়ের খোঁজে মাইকিং করেন।
মেয়ে হারানোর খবর দেশব্যাপী জড়িয়ে দিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও দৌড়ঝাঁপ করেন জাকির হোসেন। টেলিভিশনে নিখোঁজের খবর দিতে গিয়ে না পেরে পরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেন।
এরই মধ্যে একাধিক গণমাধ্যমেও গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও বাড়তে থাকে। কামরাঙ্গীরচরের বড়গ্রামের যে স্থান থেকে সুমাইয়া নিখোঁজ হয়, সেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ, র্যাব, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগও শিশুটিকে উদ্ধারে কাজ শুরু করে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে শিশুটি সম্পর্কে খোঁজখবর করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সুমাইয়ার অপহরণের বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলে।
এভাবেই কেটে যায় বেশ কিছুদিন। পরে ২৪ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট থানায় অপহরণ মামলা করেন সুমাইয়ার বাবা।
এরই মধ্যে সুমাইয়াকে উদ্ধারে জোর তৎপরতা শুরু করে পুলিশ। পুলিশ ওই এলাকার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে। ফুটেজে দেখা গেছে বোরকা পরিহিত একজন মহিলা সুমাইয়াদের বাসার সামনে ঘোরাফেরা করতে। ওই মহিলার বিষয়ে সুমাইয়ার মায়ের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর আশার আলো দেখে পুলিশ।
কারণ বোরকা পরিহিত এই মহিলা দেড় মাসের মতো সুমাইয়াদের বাসায় ভাড়া ছিল। পরে পুলিশ প্রযুক্তি ও সোর্সের মাধ্যমে অপরহণকারীদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। পরে বুধবার রাতে ব্লক রেইড দিয়ে কদমতলী থানার পাটগ্রামের একটি বাড়ি থেকে সুমাইয়াকে উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় অপহরণকারী সামিনা আক্তার বৃষ্টি ও সিরাজ ওরফে বাবুলকে।
মেয়েকে কাছে পেয়ে জাকির হোসেন
সুমাইয়াকে উদ্ধারের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ। ২৫ দিন পর মেয়েকে কাছে পেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন বাবা জাকির হোসেন ও মা মুন্নী। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই দম্পতি।
তবে পুলিশ তাদের হেফাজতে মেয়েকে দিলেও পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতের মাধ্যমে তুলে দেয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলন শেষে জাকির হোসেনের সঙ্গে কথা হয় ঢাকাইমসের। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবাদিকসহ এলাকার মানুষ যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
বলেন, ‘আমার মেয়েকে উদ্ধারে পুলিশ, সাংবাদিকসহ সবাই সাহায্য করেছে। আমি এখন খুশি। প্রমাণ হইল পুলিশ চাইলে সব পারে। সবাইরে ধন্যবাদ। আমার দাবি, যারা ঘটনায় জড়িত সবার উপযুক্ত শাস্তি। যাতে আর কারো বাচ্চার এমন অবস্থা না হয়।’
পুলিশ কর্মকর্তারা যা বললেন
সুমাইয়াকে উদ্ধারের বিষয় কথা বললে পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ ইব্রাহীম খাঁ বলেন,‘আমরা ঘটনার ক্লু পেয়ে কাজ শুরু করি। যার ফলে সফলতা পেয়েছি। মেয়েটিকে উদ্ধার করতে পেরে আমরাও খুশি।’
শুরুতে পুলিশের তৎপরতা কম ছিল- সুমাইয়ার পরিবারের এমন বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সব ঘটনাকেই গুরুত্ব সহকারে দেখি। এই অপহরণের ঘটনায় আমরা শুরুতে আমরা ক্লু পাইনি। পরে ভিডিও ফুটেজে ঘটনার ক্লু পাওয়ায় রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছি।’
ঘটনার শুরু থেকে এ নিয়ে কাজ করা কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি শাহীন ফকির ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘শুরু থেকেই ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়েছে। আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করে অপরাধীদের আটক করেছি, শিশুটিকেও সুস্থভাবে উদ্ধার করতে পেরেছি।’
ঢাকাটাইমস
