মতামত

জেনারেল শিক্ষকদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে অশিক্ষক জমিয়ত সভাপতির এমন বক্তব্য শিক্ষক সমাজের প্রতি চরম অপমানের অশনিসংকেত -ফিরোজ আলম

মাদ্রাসার কিছু সংখ্যক শিক্ষকদের সংগঠন (অধ্যক্ষদের) জমিয়াতুল মোদার্রেসিনের সভাপতি এম এম বাহাউদ্দিন সাহেব মাওলানা এম এ মান্নান এর ১৫তম ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মাদ্রাসার জেনারেল শিক্ষকদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন।তিনি বলেছেন
মাদরাসা শিক্ষার্থীদেরকে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞানসহ কর্মমুখী নানা বিষয় পাঠদান করানো হচ্ছে। যার ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে অতিরিক্ত বিষয় ও নম্বরে পড়াশুনা করে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা কৃতীত্বের সাথে উত্তীর্ণ হচ্ছে। এজন্য মাদরাসাগুলোতে কিছু কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারাই এখন মাদরাসাগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। যা কোনভাবেই বরদাশত করা হবে না। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের মাদরাসা প্রধান হওয়ার দুঃসাহসিকতাকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। প্রয়োজনে সারাদেশ থেকে এর বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
এবার তার কথার আলোকে বলি, তিনি বলেছেন ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি জেনারেল শিক্ষার জন্য কিছু সংখ্যক কর্মচারি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে অর্থাৎ তিনি জেনারেল শিক্ষকদেরকে শিক্ষক হিসেবে ও মানতে নারাজ। তিনি জেনারেল শিক্ষকদেরকে মাদ্রাসার কর্মচারি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।তার এমন বক্তব্য মাদ্রাসার জেনারেল টিচারদের প্রতি চরম অবমাননা,অস্বাভাবিক চরম দু: সাহসিকতা এবং একটি নিদারুন কলংক এবং চরম মিথ্যাচারের ও শামিল।তিনি আরও মিথ্যাচার করছেন জেনারেল শিক্ষকরা নাকি জোর পূর্বক মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রন নিতে চায়।আজ পর্যন্ত জেনারেলদের সংগঠন বাংলাদেশ মাদ্রাসা জেনারেল টিচার্স এসোসিয়েশন পক্ষ থেকে এমন কোন দাবি ও করেনি।বরং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন বাস্তবায়নে যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালিত হওয়া জরুরি।তাই ২০০৭ সালের কামিল – মাস্টার্স সমমান হওয়ায় নীতেতে এরাবিক হোক কিংবা জেনারেল হোক যোগ্য লোকদের মাধ্যমে মাদ্রাসা পরিচালিত করতে হবে এমন যৌক্তিক দাবি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তুলে ধরেছেন।কারন ২০১০ সালের নীতিমালা মোতাবেক ২১ জন জেনারেল শিক্ষক সারাদেশে মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে নিয়োগ পান এবং এখনো পর্যন্ত তারা অত্যন্ত সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।জেনারেল টিচারদের দাবির মধ্যে কখনোই ছিলনা যে শুধু জেনারেল শিক্ষিতরাই মাদ্রাসা পরিচালনা করবে কিংবা এরাবিক শিক্ষিতরা মাদ্রাসা পরিচালনা করতে পারবেনা।মনে রাখা দরকার প্রশাসন পরিচালিত হয় সরকারি বিধি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী। এখনে মনগড়া নীতি পরিত্যাজ্য। কাজেই এরাবিক হোক কিংবা নন এরাবিক হোক তাতে প্রশাসন পরিচালনায় যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তি হওয়াই মূখ্য কথা।

অন্যদিকে উপমহাদেশে আলেম-ওলামাদের হাত ধরেই মাদরাসা ও ইসলামী শিক্ষার প্রসার হয়েছে একথাটি চরম সত্য।যেহেতু সরকারি নীতিমালার বাহিরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ার সুযোগ নেই কাজেই প্রশাসন পরিচালনায় যিনি থাকুন না কেন তাতে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের পথে কোন বাধা থাকার কথা নয়।কারন মাদ্রাসার প্রধান এরাবিক থেকে হলেই যে ইসলামি প্রচার ও প্রসার বাড়বে কিংবা নন এরাবিকরা প্রধান হলে ইসলামের প্রচার ও প্রসার বন্ধ হয়ে যাবে এমন কোন যুক্তি কি আদৌ গ্রহনযোগ্য? সৃষ্টির শুরু থেকে আজ ও পর্যন্ত ইসলামের যত প্রচার ও প্রসার হয়েছে কিংবা যারা প্রচার ও প্রসারে গুরুত্ব পূর্ন ভূমিকা রেখেছেন তারা কি সবাই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন?অন্যদিকে জেনারেল শিক্ষিতরা কি মুসলমান নয়? তারা কি ইসলাম বিরোধী? তারা কি নামায পড়েনা? তারা রোযা রাখেনা? হজ্জ্ব করেনা? তারা কি রাত্রি জেগে তাহাজ্জুত পড়েনা? কাজেই জমিয়ত সভাপতির এমন বক্তব্য অশিক্ষক সুলভ বৈ আর কিছুই নয়।
অন্যদিকে জেনারেল শিক্ষত কারা? জেনারেল শিক্ষিত পাঁচ রকমের।

এক.যারা আরবি ভালভাবেই পড়তে পারে। কিন্তু এস এস সি,এইচ এস সি এবং উচ্চ শিক্ষা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়েছেন।

দুই•যারা মাদ্রাসায় দশ বছর তথা দাখিল তথা এস এস সি পরীক্ষা পাস করার পর মাদ্রাসায় লেখা পড়া না করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করেছেন।

তিন•যারা মাদ্রাসায় ১২ বছর পর্যন্ত তথা আলিম তথা এইচ এসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন।তারপর কলেজ -বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখা পড়া শেষ করেছেন।

চার•যারা কোন মতেই আরবি পারেন না। শুধু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন।

পাঁচ•যারা মাদ্রাসাায় ১২ বছর লেখাপড়া করেছেন তথা আলিম পাসের পর কোন কলেজ- বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ালেখা না করে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় স্বীকৃত মাদ্রাসাতেই জেনারেল বিষয়ে যথা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি কিংবা আইসিটি বিষয়ে অনার্স এবং মাস্টার্স এ লেখা পড়া শেষ করেছেন।
এই পাঁচ শ্রেণীর জেনারেল বর্তমানে দেখা যায়। উপরের আলোচনায় স্পস্ট ৮০% জেনারেল যেখানে আরবি জানে সেখানে জেনারেল শিক্ষকদের মাদ্রাসা বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন মোটেও কাম্য নয়।
কাজেই মিথ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে জেনারেল শিক্ষকদের হুমকি বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ বরদাশত করবেনা।
জমিয়ত অশিক্ষক সভাপতির কুরুচিপূর্ন মিথ্যাচার এবারই প্রথম না ,এর আগে ও কয়েকবার তিনি নিজে এবং কথিত আছে তার মালিকানাধীন মাদ্রাসা শিক্ষকদের টাকায় গড়ে উঠা ইনকিলাব পত্রিকার মাধ্যমে মিথ্যাচার করেছেন।বাংলাদেশ মাদ্রাসা জেনারেল টিচার্স এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বারবার তার প্রতিবাদ ও করা হয়েছে।২৭ শে নভেম্বর ২০১৯ সালে তিনি বলেছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষকদের মাসিক বেতন নাকি ৬০ হাজার টাকা এবং অধ্যক্ষদের মাসিক বেতন নাকি ১ লাখ টাকা যা চরম মিথ্যা কথা।অথচ একজন সহকারি শিক্ষক বিএডধারী এবং উচ্চতর স্কেল পাওয়ার পর ও তার বেতন বর্তমানে মাত্র ২২ হাজার টাকা,এমন কি কামিল মাদ্রাসার একজন অধ্যক্ষের মাসিক বেতন ৫০ হাজার টাকা। তিনি সেই অনুষ্ঠানে মাদ্রাসার ৯৯% এরাবিক – নন এরাবিক শিক্ষকদের প্রাণের দাবি জাতীয়করন নিয়ে পরিহাস ও করেছিলেন।কারন জাতীয়করন হলে তার আয় বন্ধ হয়ে যাবে।
৫ ই নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার তথ্য মোতাবেক প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ইনকিলাব এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের পরিচালক ও ইনকিলাব পত্রিকার সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।দুদকের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বাদী হয়ে দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি দায়ের করেন। মামলা নম্বর ১। মামলায় বাহাউদ্দীনের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৭০ লাখ ২৯ হাজার ৪৩৩ টাকার জ্ঞাত বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়েছে।
তিনি যে মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালান তার আরো কিছু প্রমান তুলে ধরলাম
২০১৪ সালের ১৬ ই জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলো এবং বিবিসি নিউজ ২০১৪ সালের ১৭ ই জানুয়ারি তারিখের পত্রিকার তথ্য থেকে জানা যায়

‘সাতক্ষীরায় যৌথবাহিনীর অভিযানে ভারতীয় বাহিনীর সহায়তা’ শিরোনামে একটি খবর ছাপা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমতিসাপেক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লির কাছে চিঠি দিয়ে ওই সহায়তা চেয়েছে। এতে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বিধায় তার বিরুদ্ধে মামলা ও হয়।

২৮ শে জুন ২০২০ দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায় দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীনসহ এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, জাতীয় সংসদসহ কয়েকটি বিষয়ে ‘ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা’ প্রতিবেদন প্রকাশের অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেছেন সুপ্রীমকোর্টের একজন আইনজীবী। গুলশান থানায় অভিযোগ দায়ের করেন ব্যারিস্টার সৌমিত্র সরদার। গুলশান মডেল থানার ওসি এস এম কামরুজ্জামান জনকণ্ঠকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন।
১৬ ই আগস্ট ২০২০ দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার সম্পাদকের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মানহানির মামলা করেছিলেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এভাবে যখনি মাদ্রাসার জেনারেল শিক্ষকরা এরাবিক শিক্ষকদের ন্যায় সমপদে সম মর্যাদার যৌক্তিক দাবি তুলেছে ঠিক তখনি খাদকরা সে দাবি নস্যাৎ করার পরিক্ল্পনা করেছে ।
এভাবে মাদ্রাসার আলেমদের সংগঠন জমিয়তের সভাপতি যদি মিথ্যা ও ভুল তথ্য দিয়ে শিক্ষকদের অপমানিত করেন, জাতিকে ভুল পথে পরিচালিত করেন তার কি শিক্ষক নেতা হওয়ার যোগ্যতা থাকে?
অন্যদিকে জমিয়ত সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী জেনারেল শিক্ষকদের প্রতিহত করা হবে এমন কথা শোনার পর যে সমস্ত জেনারেল শিক্ষক জমিয়তের সাথে যুক্ত ছিলেন তাদের কি এখনি জমিয়ত ছাড়ার উপযুক্ত সময় নয় কি? জমিয়তের সাথে যুক্ত মাদ্রাসার জেনারেল শিক্ষকদের বলছি, স্যারেরা,জেনে রাখবেন জমিয়ত আপনাকে কখনোই আপনার যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ দিবেনা,আপনাকে ব্যবহার করে তারাই ফায়দা লুটে নিবে।মাদ্রাসার এরাবিক- নন এরাবিক স্যার- হুজুরদের বলছি জমিয়ত কখনোই আপনাদের কাঙ্খিত বুকে লালিত জাতীয়করনের পথকে সহজ করবেনা। তারাই মাদ্রাসা জাতীয়করনের প্রধান বাধা।তাই আজই জমিয়ত কে বর্জন করুন।

মাদ্রাসার এরাবিক -নন এরাবিক শিক্ষক ভাই ভাই।কাজেই তাদের সম মর্যাদা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া দোষের কিছু না।কারন এরাবিক- নন এরাবিক শিক্ষকদের যৌথ প্রচেষ্টাই মাদ্রাসার ছাত্ররা গড়ে উঠে।
সাথে সাথে মাদ্রাসার সকল জেনারেল শিক্ষকদের কে ভুল বোঝাবুঝি কাটিয়ে একতা বদ্ধ হয়ে কাজ করতেই হবে।নাহলে শ্রম বাড়বে,অর্থ নষ্ট হবে,বিরোধীপক্ষ শক্তিশালী হবে, সময় নষ্ট হবে, জাতীয়করন সহ অন্যান্য কাঙ্খিত ফলাফল অধরাই থেকে যাবে।

ফিরোজ আলম,
বিভাগীয় প্রধান,(অনার্স,এম.এ শাখা) ,আয়েশা (রা:) মহিলা কামিল ( অনার্স,এম.এ) মাদ্রাসা, সদর, লক্ষীপুর ।
সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক,
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ও সাধারন সম্পাদক,লক্ষীপুর জেলা শাখা,বিএমজিটিএ।

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয় ।