leadnewsসারা দেশ

কিশোরগঞ্জের হাওরের উন্নয়নে কান্ডারী এমপি তৌফিক

সফিকুল ইসলাম: বর্ষায় নাও, শুকনায় পাও। অর্থাৎ বর্ষাকালে নৌকা আর শুকনো মৌসুমে পায়ে হাঁটা ছাড়া বিকল্প ছিলো না কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে। গেল দশ বছরে বদলে গেছে দিন। যোগাযোগ, অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কোনো কিছুতেই আর পিছিয়ে নেই কিশোরগঞ্জের হাওরবাসী। আর এসবই সম্ভব হয়েছে ওই এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নিরলস প্রচেষ্টায়। তাদের সার্বিক প্রচেষ্টা আর পরিশ্রমের মধ্যদিয়ে বদলে যাচ্ছে কিশোরগঞ্জের অপার সম্ভাব্যনাময় পর্যটনখ্যাত হাওরঅঞ্চল।
গত ২০ জুলাই গাড়িতে চড়ে তিনি কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক পরিদর্শন করেন রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদ। আর সেই গাড়ির চালক ছিলেন হাওর উন্নয়নের অন্যতম রূপকার রাষ্ট্রপতির বড় ছেলে ও কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক। হাওরের উন্নয়নে রাষ্ট্রপতির স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে তার ছেলের মাধ্যমেই। তাই তো হাওরবাসীর স্বপ্নপূরণের বিস্ময়কর সড়ক ভ্রমণে চালকের আসনে ছিলেন তার ছেলে তৌফিক। এ বিষয়ে কথা হয় রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক এর সাথে। তিনি জানান, গত অর্থবছরে প্রায় ৯’শ কোটি টাকা ব্যয়ে ইটনা, মিঠাইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলাকে যুক্ত করে সারাবছর চলাচল উপযোগী ২৯ কিলো মিঠার সড়ক নির্মাণ করে সড়ক বিভাগ। আর এ সড়ক নির্মাণের পর বদলে যায় হাওরের সার্বিক চিত্র। আগামীতে কিশোরগঞ্জের এই হাওরকে আরো উন্নত করতে তাঁর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, গতবছর হাওরের সাথে জেলা সদরের সাথে যোগাযোগে বিভিন্ন নদীতে ৫টি ফেরি দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম থানায় পুলিশের তিনটি নতুন ও অত্যাধুনিক মডেলের পিকআপ সরবরাহ করা হয়। মিঠামইন থানার পিকআপে করে রাষ্ট্রপতি বাবাকে স্বপ্নের সড়ক পরিদর্শনে নিয়ে যান কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের এমপি রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক।
নিকলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুছ তালুকদার জনি জানান, বর্ষায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্রমণপিপাসু লোকজন বেড়িবাঁধে আসে। বেড়িবাঁধ থেকে নৌকা নিয়ে ছাতিরচরের করচের বনে ঘুরতে যান দর্শনার্থীরা। বর্ষায় ঈদের কয়েক দিনে লাখ লাখ নারী-পুরুষের পদচারণায় বেড়িবাঁধ হয়ে উঠেছিল সমুদ্রসৈকতের বিকল্প। তিনি বলেন, বেড়িবাঁধ ঘিরে পর্যটনের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এ নিয়ে উপজেলা প্রশাসনসহ পর্যটন বিভাগকে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। এতে এলাকার মানুষের জীবন মান উন্নয়নসহ দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। করিমগঞ্জ উপজেলার পরিষদের চেয়ারম্যান মো.নাসিরুল ইসলাম খান বলেন, বালিখলা ও হাসানপুর ব্রিজ এবারের বর্ষায় আনন্দের নতুনমাত্রা যোগ করেছিল। হাওরের বুক চিরে গড়ে ওঠা বিশাল পিচঢালা সড়কের দুই ধারে হাজার হাজার জলযানের উপস্থিতি এক অপূর্ব দৃশ্যের সূচনা করেছিল। কাকডাকা ভোর থেকেই শত শত মানুষ বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে বালিখলার সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করেছিলেন। বিশেষ করে পানির ওপর নৌকায় বসে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অপার আনন্দে বিভোর ছিলেন ভ্রমণপিপাসুরা। সারাদিন পানিতে থেকে প্রকৃতির নানা রঙ ও রূপ দেখে হাজার হাজার মানুষ অভিভূত হন।
সরজমিনে দেখা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনা উপজেলার প্রায় সবটুকু এলাকাজুড়ে বিস্তৃত নিকলী হাওর। এ হাওরের সৌন্দর্যে খুঁজে পাওয়া যায় গ্রামীণ পরিবেশের স্বকীয়তা। আর শহুরে জীবনে বেড়ে ওঠা তরুণ বন্ধুদের কাছে জানা-অজানার মধ্যে লুকিয়ে থাকা এমন সব জায়গাই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বিশাল জলরাশির বুকে বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট গ্রাম। যেন একেকটা ছোট ছোট দ্বীপ। হাওরজুড়ে গলা ডুবিয়ে থাকা হিজল গাছের সারি বা পানির নিচ থেকে জেগে ওঠা করচের বন কিংবা শুশুকের লাফ-ঝাঁপ মুহূর্তেই আপনার মন ভালো করে দেবে। কিশোরগঞ্জ হাওর এমনই। নৌকা চলতে শুরু করা মাত্রই হারিয়ে যেতে হয় জলরাশির রাজ্যে। দূর থেকে আরো যত দূরে চোখ যাবে, স্নিগ্ধ গ্রামের মতোই শান্ত অথৈ পানি প্রাণ জুড়িয়ে দেবে। জলের সীমানা শেষ হতেই যেন বিস্তৃত আকাশ। তারই মাঝখানে কিছু ঘরবাড়ি। নৌকার চালকদেরই বসবাস এখানে। মাছ ধরার সাথেও জড়িত এ অঞ্চল। এ হাওরের মাছ বিক্রি হয় প্রতিদিন শহরের বাজারে। কিন্তু তাদের মূল পেশা কৃষি। নৌকার মাঝির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুকনো মৌসুমে হাওর পরিণত হয় উর্বর মাঠে। নানা ধরনের সবজি চাষ হয় তখন পুরো সময়জুড়ে। বেশিরভাগ গ্রামের মতোই শিক্ষার হার এখানেও কম। নৌকায় ঘুরতে ঘুরতে শোনা যাবে গ্রামের শিশুদের মিষ্টি কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান। জেলেদের নৌকা, শিশুদের সাঁতার কাটা আর হাওরের মাঝখানে ছোট-বড় গাছ প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়া বাংলার গ্রামের সৌন্দর্য চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলবে। দিনশেষে হয়তো ফিরতে হবে আবারো শহুরে জীবনে। কিন্তু প্রতি বর্ষায় কিশোরগঞ্জ হাওর ভ্রমণ বিলাসীদের মনে তৈরি করতে থাকবে আকাঙ্খা।
হাতের কাছে আরেক রাতারগুল: হাওরে ঘুরতে ঘুরতে চলে যাবেন ছাতিরচরে। পানির নিচে ডুবন্ত এক সবুজ বন। লেয়ারে লেয়ারে সাজানো সুবজ গাছ। গাছের বুক বরাবর পানিতে ভাসতে থাকবেন আপনি। হুট করে দেখে আপনার কাছে মনে হতে পারে এটা আরেক রাতারগুল। নিকলী বেড়িবাঁধ থেকে নৌকায় সরাসরি ছাতিরচর যেতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। নৌকায় ৩ ঘণ্টা ঘুরলে মোটামুটি অনেকটা জায়গা ঘুরে আসতে পারবেন।
নৌকা ভাড়া: সাধারণত এক ঘণ্টার জন্য ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নেয়। আবার কয়েক ঘণ্টার জন্য নিতে পারেন প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকার মতো করে। অবশ্যই ভাড়া দামাদামি করে নিবেন। এতে আরও কমতে পারে। নৌকাগুলো বেশ বড়সড়ও হয়। ১৫-২০ জন পর্যন্ত অনায়াসে নাচানাচি করে ঘুরে আসতে পারবেন। নৌকার সাইজ অনুযায়ী ভাড়া খুব একটা কমবেশি হয় না। নিকলীতে খাবারের ব্যবস্থা: মূলত নিকলীতে ভালো মানের খুব বেশি খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। তবে বাজারে বেশ কয়েকটা রেস্তোরাঁ আছে। মোটামুটি মানের তাজা মাছের রান্না দিয়ে খেতে ভালোই লাগবে। এছাড়াও বেড়িবাঁধে ঢোকার সময়ই একটা রেস্তোরাঁ পড়ে; সেই রেস্তোরাঁয় নদীর তাজা মাছের আঞ্চলিক স্বাদের খাবার খেয়ে নিতে পারেন। রাত কাটাতে পারেন নৌকায়: ভরপুর কোনো পূর্ণিমা রাতের গাঢ় নীল আকাশের নিচে নৌকার ছাদে কাটিয়ে দিতে পারেন পুরো একটি রাত। ওখানে রাতে থাকাটা মোটামুটি নিরাপদ। যদি আবহাওয়া ভালো থাকে।