অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের বিপদ
আঙুলের ব্যথায় চামচ ধরতেও কষ্ট হচ্ছে; আঙুল ও কবজিতে আড়ষ্ট ভাব; ঘাড়ে টান ধরা, চোখ ব্যথা ও হাত তুলতে কষ্ট হচ্ছে। এ সবই হলো অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিপদ।
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সব কাজ হচ্ছে বাড়ি থেকে। বেড়েছে মোবাইল ব্যবহার। বদলে যাওয়া জীবনে বেশিরভাগেরই এমন অভ্যাস হচ্ছে। মানুষজন নানা ধরনের অ্যাপনির্ভর স্মার্টফোনগুলোতে দিন দিন প্রচণ্ড পরিমাণে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
এই লকডাউনের দিনগুলোতে দিনভর হাতে মোবাইল, ঘাড় নাচু, চোখ স্ক্রিনে। মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে হাতের আঙুল আড়ষ্ট হয়ে পড়ছে, ঘাড় ঘোরাতে গেলেই টান ধরছে, চোখ কড়কড় করছে, হাত তুলতে কষ্ট হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই এই সমস্যা নিয়ে অনেকে চিকিৎসকদের দারস্থ হয়েছেন। ভারতের কলকাতার অস্থি শল্যচিকিৎসক সুদীপ্ত ঘোষ বলেন, মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের অনেক ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। বহু মানুষ বিভিন্ন ভঙ্গিতে বসে মোবাইল ব্যবহার করেন। ফলে পিঠ-কোমরেও বহু সময়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে হাতের। নাগাড়ে মোবাইল ব্যবহার করার ফলে পেশিতে টান পড়ে। রক্তচলাচলের গতিও কমে। এরই ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা বেদনার সূত্রপাত।
তিনি আরো বলেন, যে মোবাইল ব্যবহারের সময়ে নাগাড়ে ঘাড় নিচু করে ব্যবহার করা ঠিক নয়। টেবিলে চোখের সোজাসুজি রেখে মোবাইল ব্যবহার করলে ভাল হয়।
অতিরিক্ত সময় মোবাইল ব্যবহারে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে
– ব্রিটেনের হ্যান্ড ও এলবো সার্জন চিকিৎসক রজার পাওয়েল এক গবেষণাপত্রে জানিয়েছেন, দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে মোবাইলে টেক্সট লিখলে টেক্সট ক্ল এবং সেলফোন এলবো নামে আঙুল ও কবজির সমস্যা দেখা যায়। ডাক্তারি পরিভাষায় এই সমস্যার নাম কিউবিটাল টানেল সিনড্রোম। অনবরত টেক্সট লিখলে বুড়ো আঙুল, তর্জনী ও মধ্যমা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়। ফলে আঙুল দু’টির কাছাকাছি থাকা স্নায়ুর উপরে বাড়তি চাপ পড়ে। এর জেরে প্রথমে আঙুল অসাড় লাগে। পরের দিকে ব্যথা হয়। এর থেকে রেহাই পেতে আঙুল স্ট্রেচ করতে পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসক।
– যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তারা একনাগাড়ে মোবাইলে কথা বললে ঘাড়ে ও কাঁধে ব্যথার সাথে মাইগ্রেনের মাথা ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে। টাচ ফোনে নাগাড়ে মেসেজ করলে বেশি বয়সে হাতের কবজি ও আঙুলে ব্যথার আশঙ্কা খুব বেশি।
– দিনরাত মোবাইল সাথে রাখেন এমনকি, বাথরুমে ও ঘুমনোর সময়েও মোবাইল সাথে নিয়ে যান তাদের পেশি ও স্নায়ুতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে স্ট্রেন ইনজুরির ঝুঁকি বাড়ে।
– অনেকে কনুইয়ে ভর দিয়ে মোবাইলে টেক্সট করেন বা কথা বলেন। অতিরিক্ত সময় ধরে এমন করলে হাত, কাঁধ, ঘাড় ব্যথার ঝুঁকি বাড়ে।
– রাতের অন্ধকারে মোবাইলের নীল আলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে ইনসমনিয়া অর্থাৎ অনিদ্রার ঝুঁকি বাড়ে। একইসাথে ‘সিভিএস’ অর্থাৎ ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’ অর্থাৎ চোখের জল শুকিয়ে গিয়ে চোখের সংক্রমণ হয়, চোখ কড়কড় করে।
– অনেকে আবার অ্যালার্ম সেট করে রাতে ফোনটি মাথার কাছে রাখে। ফোনের মাইক্রো-ওয়েভ রেডিয়েশনের মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্যানসার বা টিউমার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাত, মাথা ঘোরা, হতাশা, মেজাজ খারাপ হওয়া, উদ্বেগ ও আরো অনেক শারীরিক ও মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
– কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোন পকেটে রাখলে পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়। মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন শুক্রাণুর পরিমাণ, সংখ্যা ও ঘনত্ব হ্রাস করতে পারে। তাই পুরুষদের সারাক্ষণ পকেটে স্মার্টফোন রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিৎ।
– অনেকেই মোবাইল ফোনে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েন, যা মস্তিষ্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আবার দেখা যায়, মোবাইল ফোনের সাথে হেডফোন লাগিয়ে তা কানে দিয়ে ঘুমানোর আগে গান চালান অনেকেই। এটি আরো মারাত্মক ক্ষতিকর।
এই সব সমস্যা প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হল মোবাইল ফোনের ব্যবহারে মাত্রা টানা। মোবাইল ব্যবহার কমানো না গেলেও কিছু নিয়ম মেনে চলা দরকার। তবেই নিজেকে সুস্থ রাখা সম্ভব।
– স্পিকারে কথা বলা। সব আঙুল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করা। টানা ফোন ব্যবহারের ফাঁকে হাত-আঙুল স্ট্রেচিং করে নেয়ার মতো অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।
– চোখের ওপর ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে মুখ থেকে ন্যূনতম ১৬ ইঞ্চি দূরত্বে মোবাইল ফোনের স্ক্রিন রাখার পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া মোবাইল ব্যবহারের সময় প্রতি ২০ মিনিটের পর কিছুটা বিরতি নেয়া উচিত। চোখে কোনো ধরনের চাপ অনুভব করলে, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
– ঘাড় ও পিঠে ব্যথার ঝুঁকি থেকে মুক্তি পেতে স্মার্টফোন ব্যবহার করার সময় শরীর ও মেরুদণ্ড সঠিকভাবে রাখতে হবে।
– পর্যাপ্ত ঘুম ভালো শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য অন্যতম প্রধান প্রয়োজন। তাই বিছানায় যাওয়ার পর স্মার্টফোনে ওয়েব ব্রাউজিং বা ভিডিও এবং সিনেমা দেখা বন্ধ করা উচিৎ। ঘুমের সময় মোবাইল ফোনটিও দূরে রাখতে হবে।
গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত সময় মোবাইল ফোনের ব্যবহারে তরুণদের মধ্যে যে শারীরিক সক্রিয়তা কমে, তাতে অকালমৃত্যু, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও নানা ধরনের ক্যানসার হতে পারে। সুস্থ থাকতে ফোনের ব্যবহার কমিয়ে আরো বেশি ব্যায়াম ও শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানোর নানা কাজে যুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

