বিশ্ব শিক্ষক দিবস: মেধাবীদের প্রশ্নবিদ্ধ মূল্যায়ন
ফিরোজ আলম:শিক্ষক মানে জাতির আলোকবর্তিকাবাহী ,মস্তিষ্কপ্রধান নৈপুণ্যের কারিগর ,মানব জাতি গড়ার হাতিয়ার, বন্ধু, দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক,দর্শন তত্ত্বের একজন মস্ত বড় পন্ডিত।উল্লেখিত সত্যগুলি আজ নিরবে কাঁদছে আর বইয়ের পাতায় দেখা যাচ্ছে।কারন নির্লজ্জ রাজনৈতিক বেহায়াপনায় মেধার অবমাননা আমাদের মেধাবীদের এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নির্ণয়ের সুপরিচিত বৈশ্বিক Ranking র্যাং কিং কোয়াককোয়ারেলি সায়মণ্ডসের (কিউএস) র্যাং কিং থেকে দেখা যায় ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়- ৩৬৫তম পজিশনে, ২০১০ সালে ঢাবি ও বুয়েট ৫৫০ থেকে ৬০০- তে, ২০১২ সালে ছিল ৬০১ থেকে ৭০০-এর মধ্যে,২০১৪ তে ছিল ৭০১ থেকে ৮০০-এর মধ্যে।
এ বছর ২০২২ সালে র্যাং কিংয়ে তাদের স্থান হয়েছে ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে।
অর্থাৎ গত ১৭ বছরে আমরা র্যাং কিংয়ে প্রায় ৩৬৫ থেকে ৫০০ ধাপ পিছিয়ে গেছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাসে বৈশ্বিক পদমর্যাদার সারিতে এটি নিশ্চয় অসন্মানের,লজ্জার এবং সবচেয়ে বাজে অবস্থার বহি:প্রকাশ নিঃসন্দেহে ।
আমরা ভুলে গিয়েছি যে, একটি
বিশ্ববিদ্যালয় যেমনি গণতন্ত্র কিংবা স্বৈরতন্ত্র দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না,তেমনি রাজনৈতিক বিবেচনায় ও না।বরং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হবে দলীয় লেজুড়বৃত্তির পাস কাটিয়ে সবচেয়ে মেধাবী
সম্মানজনক ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে আরোহনের মাধ্যমে।যেখানে শিক্ষক ,বিভাগীয় প্রধান, ডিন, প্রভোস্ট , প্রোভিসি , ভিসি নিয়োগ হবে লাল দল, নীল দল, বিভিন্ন রঙের দল ছাপিয়ে শুধু মেধার ভিত্তিতে এবং গবেষনা কর্মের ভিত্তিতে।যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশীয় -বিদেশীয় লক্ষ লক্ষ ছাত্র ছাত্রীর কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরা তাদের অনুসরন করবেন নি: সংকোচে।
যুক্তরাষ্ট্র,কানাডা,যুক্তরাজ্য সহ পৃথিবীর প্রথম সারির ১০০টির ও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের মানদন্ডে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য দেয় তা হল
ক.কোয়ালিটি পিপল ।মানে সবচেয়ে যোগ্য লোকটি নিয়োগ।খ.নিয়োগপ্রাপ্ত কোয়ালিটি পিপলের জন্য ল্যাব,শিক্ষা উপকরন সহ প্রয়োজনীয় উপকরন,আর্থিক নিরাপত্তা।
গ.সক্ষমতা থাকা সাপেক্ষে বেঁচে থাকা পর্যন্ত শিক্ষকতার সুযোগ দান।
ঘ.গবেষণা কর্ম ও প্রকাশনা বিবেচ্য হওয়া।
অথচ বাংলাদেশে তার কোনটাই যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।ফলে আমরা মানদন্ডে গত প্রায় দুই দশকে ৫০০ ধাপ পিছিয়ে গিয়েছি।
অনেকে হয়ত বলবেন বাংলাদেশ সরকার তো বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (হেকেপ) হাতে নিয়েছে।তাদের জন্য বলি ঠিক আছে।কিন্তু উক্ত প্রকল্প রান করার দায়িত্ব কি যোগ্য ও সৎ ব্যক্তির হাতে পড়েছে?মনে রাখতে হবে কোয়ালিটি বাড়াতে গেলে কোয়ালিটি ফ্যাকাল্টি চাই,আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন কোয়ালিটি ফ্যাকাল্টি আছে? তাহলে শিক্ষায় সুফল আসবে কি করে।
এতক্ষন মেধা,যোগ্যতা,সততা,স্বাধীন ও কোয়ালিটি নিয়ে এত বলার কারন হল একজন ভিসি রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন কোয়ালিটি পিপল না হলে তাঁর পক্ষে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ, প্রমোশনের ক্ষেত্রে মেধা,গবেষনা ও প্রকাশনার মানদন্ড কল্পনাতেই থেকে যাবে।শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুলো তখন শিক্ষিত লোকদের বস্তিতে পরিনত হবে।যা বাংলাদেশে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সচরাচর পরিলক্ষিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় কম যোগ্যতা সম্পন্ন বেশির ভাগ নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ায় এরাই যখন প্রমোশন পেয়ে কোন বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন তখন তারা ও অযোগ্য লোকদেরকেই নিয়োগ দিয়েছেন।যার ফল আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার করুন চিত্র।
বাংলাদেশের বেসরকারি আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে ও একই ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশিরভাগ অধ্যক্ষ নিয়োগ হচ্ছে।ফলে শিক্ষার গুনগত মানের তুলনায় পাসকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বেসরকারি কলেজ- মাদ্রাসার সহকারি অধ্যাপক পদে পদান্নতি মানদন্ডের প্রথমেই আগে নিয়োগকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে।শিক্ষাগত যোগ্যতাকে ধরি মাছ না ছুই পানিতে পরিনত করা হয়েছে।একই দিনে দুই জন শিক্ষক নিয়োগ পেলে বয়সকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।মেধা প্রথাকে গোল্লায় পাঠানো হয়েছে।
শিক্ষায় মেধাবীদের প্রতি অবহেলায় শিক্ষার মান নিয়ে উচ্চকণ্ঠে আজ গর্ব করে আমাদের বলার মত কিছু নেই।আমেরিকায় সারা পৃথিবীর ৫ শতাংশ মানুষের বাস অথচ শ্রেষ্ঠ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০টিই তাদের। রাশিয়ার সারা পৃথিবীর প্রায় ২ শতাংশ মানুষের বাস অথচ শ্রেষ্ঠ ৩০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭টিই তাদের।অথচ বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় জায়গাই পায়নি।এর পরে গিয়ে ৪ টি স্থান পেয়েছে। তার মানে কি বোঝা গেল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ শিক্ষকদের প্রাধান্য না দেওয়ায় একদিকে বেকারত্ব তৈরি করছে অন্যদিকে বিদেশীদের নিয়োগ দিয়ে আমাদের দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
টিআইবি বলছে, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করে। তাদের পিছনে বছরে ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।
নিয়োগ দাতাদের যুক্তি দেশে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে। অথচ বিদেশী শ্রমিকরা কর্মে দক্ষ।এর অর্থ দাঁড়ায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সময়ের চাহিদা মেটাতে পারছে না।যোগ্য ও দক্ষতা ভিত্তিক জাতি তৈরিতে আমরা ব্যর্থ।
এখন প্রশ্ন হল তাহলে কি আমাদের শিক্ষকরা গভেষনাধর্মী মানসম্মত শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে?যদি বলি শিক্ষকরা কিসের বিনিময়ে এত বেশি শ্রম দিবেন? ৩০ পার হওয়ার আগেই একজন সাকিব আল হাসান কোটি কোটি টাকা কিংবা একজন নেইমার কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো উপার্জন করে। আর তার দ্বিগুণ বয়সে পৌঁছেও একজন পাকা চুলের মেধাবী শিক্ষক,বিজ্ঞানী কিংবা আইনস্টাইনের যোগ্য উত্তরসূরী শিক্ষক তাদের ১ শতাংশ কিংবা ঢের কম ও আয় করতে পারে না।এমতাবস্থায় একজন মেধাবী শিক্ষক,গবেষক,বিজ্ঞানী কোনোরকম আর্থিক নিরাপত্তা এবং প্রনোদনা ছাড়াই কেন জ্ঞান নিয়ে ধ্যান করবে? এমন রসিকতা হয়ত পাগলে ও করবেনা।
আমরা আজ ভুলে গেছি একজন মানুষের যে কোন অঙ্গের নৈপুণ্যের থেকে মস্তিষ্কপ্রধান নৈপুণ্য অনেক বেশি আস্থাযোগ্য। একজন অটোগ্রাফ দেওয়া ক্রিকেটার এক ইনিংসে সেঞ্চুরি করার পর যে পরিমান প্রনোদনা পান পরের ইনিংস খারাপ করলে আবার দলচ্যুত ও হন।কিন্তু একজন মেধাবি ছাত্র একবার আশি কিংবা নব্বই পেলে তার পরের বার ফেল করার সুযোগই থাকেনা। তারপরও এই মেধাবীদের মূল্যায়ন নেই।কিংবা ঐ ক্রিকেটারের কিংবা সেলিব্রেটিদের তুলনায় পুরস্কার,প্রনোদনা নাই বললেই চলে।মেধাবী কিংবা মস্তিষ্কের শক্তিই আমাদের কাছে কত অবহেলিত পুরস্কার ও প্রণোদনার পার্থক্য দেখলেই বোঝা যায়। কোন ক্রিকেটার,ফুটবলার, সেলিব্রিটিরা কিংবা কোন নাচ কিংবা গানের প্রতিযোগীতায় জয়ীরা গাড়ি – বাড়ি পায় কিংবা নগদ ভাল অংকের আর্থিক পুরস্কার পায় কিন্তু মেধাবী শিক্ষক কিংবা ছাত্র-ছাত্রী জয়ী হলে সনদ আর প্রশংসা পায়।আর্থিক পুরস্কার যেটুকু পায় তা হয়ত অনেক সময় বলা ও যায় না।
আজ যুক্তরাষ্ট্র যেখানে মেধাবীদের মূল্যায়নে আর্থিক পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় STEM-এর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। S মানে সায়েন্স, T মানে টেকনোলজি, E মানে ইংলিশ, M মানে ম্যাথমেটিকস।পৃথিবীর দেউলিয়া ঘোষিত শ্রীলংকা সহ অন্য দেশ গুলো যখন মেধাবীদের মূল্যায়নে ভূমিকা রাখছে, সেখানে ইউনেস্কো গঠিত ‘একবিংশ শতাব্দীর জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশন ’দেলরস’ এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায় সার্কভুক্ত অঞ্চলে বর্তমানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ বাংলাদেশে ৫ ডলার, শ্রীলংকায় ১০ ডলার, ভারতে ১৪ ডলার, মালয়েশিয়ায় ১৫০ ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৬০ ডলার।
মেধাবীদের মূল্যায়নে একটা সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মেধাবী ছাত্রটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরীর ব্যবস্থা করত।
সে কারনে প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর চাকুরি ছেড়ে প্রফেসর আসিফ নজরুলের মত হাজারো মেধাবী ছাত্র শিক্ষকতার পেশাই বেচে নিতেন,নিয়েছেন।আর এখন ফেল করা ছাত্ররা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।সম্প্রতি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেল করে রিটেইক দেওয়া ছাত্র হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।এরকম আরো হাজারো মেধাবী বাদ পড়ে হাজারো অপদার্থ এখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিংবা পারিবারিক প্রভাব বলয় কিংবা প্রশাসনের অযোগ্যতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।সে কারনে গড়ে উঠেনা আইনস্টাইনের মত গভেষক।অথচ একজন আইনস্টাইন কোন একটি সমস্যার সমাধান যত সহজেই করতে পারবে, তা হয়ত সব বাঙালি মিলেও পারবে না।
আজ মেধাবী শিক্ষকদের পদ মর্যাদা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে সেলিব্রিটির অটোগ্রাফ নিতে মেধাবী ছাত্রদের কী আগ্রহ! অথচ মেধাবী শিক্ষক কিংবা মেধাবী ছাত্রের অটোগ্রাফ নেওয়ার মানুষই থাকেনা।
তাই এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রত্যাশা হোক
আগামির সঠিক নেতৃত্ব তৈরি করতে,আধুনিক স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার জন্য দক্ষ কারিগর তৈরি করতে,STEM নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার সুফল নিশ্চিত করতে,মস্তিষ্ক প্রধান নৈপুণ্যের যথাযথ সন্মান রক্ষা করতে,চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে মেধাবীদের আর্থিক নিরাপত্তা সহ যথাযথ মূল্যায়ন অপরিহার্য।যাতে মেধাবীরাই নিরলসভাবে পাঠ দিতে,নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাতে,স্বপ্ন দেখাতে এবং মেধা নির্ভর দেশ গড়তে প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে।
ফিরোজ আলম,বিভাগীয় প্রধান,আয়েশা ( রা:) মহিলা অনার্স কামিল মাদ্রাসা, সদর, লক্ষীপুর।
সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক,কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটি এবং সাধারন সম্পাদক লক্ষীপুর জেলা শাখা,বিএমজিটিএ।
ইমেইল

