মানব কল্যাণে রমজানের শিক্ষা
নুরুল আমিন আমজাদী:রমজানুল মুবারক রহমাত, বরকত ও কল্যাণের মাস। আমাদের খালিক ও মালিক আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জাত তার বান্দার কল্যাণে যে সব বিধি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন- রমজান তার মধ্যে সর্বোন্নত ফলপ্রসূ ব্যবস্থার নাম। রমজান শুধু নাজাত বা জাহান্নাম থেকে মুক্তির বারতা নিয়েই আসেনা, মানব কল্যাণে রমজানের ভূমিকা পার্থিব জগতেই আনেক ব্যাপক। মানবের শারীরিক, মানসিক, আত্মিক এবং ব্যক্তিগত, সামাজিক, ও জাতীয় পর্যায়ে সীমাহীন মানব কল্যাণ নিহিত রয়েছে রমজানের মধ্যে। এক কথায় রমজানের সকল শিক্ষা সম্পূর্ণ মানব কল্যাণে।
দৈহিক কল্যাণের ক্ষেত্রে রোজা একটা মানুষকে সুস্থ থাকতে শিক্ষা দেয়। বিজ্ঞানের এ যাবৎ গবেষণায় প্রমাণিত যে, রোজা মানুষকে ২১ প্রকার দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে সহায়তা করে। কিন্তু বিজ্ঞানের এ গবেষণা-ই তো শেষ কথা নয়। রোজা কি কি রোগ থেকে মুক্তিলাভে সহায়তা করে তা সবকিছু আবিষ্কার করা শেষ হয়ে যায়নি। সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী নবী মুহাম্মাদুর অতি সংক্ষেপে বলেন- ‘ছমু তাছিহ্হু’
রোজা রাখুন, সুস্থ থাকুন। আল মু’জামুল কবীর লিততাবারানী, হাদীস নং ১১৯০। মানব কল্যাণে রোজা যে সীমাহীন ভূমিকা পালন করে তার স্বীকৃতি দিতেই জার্মানের এক স্বাস্থ্যক্লিনিকের মূল ফটকে লিখে রাখা হয়েছে ছোট বাণীটি। সেখানে অনুবাদ হয়েছে এভাবে “রোজা রাখ, স্বাস্থ্যবান হবে।” মোহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ। সুরতাং রোজা মানুষের অপরিসীম শারীরিক -স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা কল্যাণ সাধন করে থাকে। সমগ্র বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আজ রোজার উপকারিতার স্বীকৃতি দিতে পঞ্চমুখ। একাদশ শতাব্দী শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক আলী ইবনে সীনা প্রাথমিকভাবে রোগীকে তিন স্পাহ রোজা রাখার প্রেসক্রিপশন দিতেন। বিশ্বের অনেক দেশে রোজার মাধ্যমে ‘চিকিৎসা ক্লিনিক খোলা হয়েছে।’ এর মধ্যে ইল্লেখযোগ্য দু একটি হচ্ছে জার্মানি “ড. হেগিজ ব্লাহমার ক্লিনিক”, ড. ব্রাশরাবজ ও ড. ওয়ালারের ক্লিনিক’।
সম্মানিত শ্রোতাম-লী, কম খাওয়া ও পেট খালি রাখা রোজার প্রশিক্ষণ। আর এখানেই যেন সমগ্র মানব কল্যাণ নিহিত। আজ চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একমত যে, পেট খালি হতে না দেয়া, ভরা পেটে খাওয়া সমস্ত রোগ বালাইয়ের জন্ম দেয়। রাসুল রাসুল রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সেই আগেই জানিয়ে দিয়েছেন- “পেট ভর্তি করে খাওয়ার চাইতে মানুষের জন্য ক্ষতিকর আর দ্বিতীয় কিছু নেই। চিকিৎসা ও সার্জারিতে নোবেল জয়ী ‘ড. আলেকসিস কারিল’ তার ‘মানুষ অজ্ঞাত’ বইতে লিখেছেন- অধিক খাবার গ্রহণ মানব জাতির অস্তিত্বের ধ্বংসের একটি বড় কারণ।
সীরাতে হালবিয়া গ্রন্থে লিখিত আছে- মিশরের কিবতী বাদশা মুকাউকিস মুসলমানদের জন্য একজন চিকিৎসক উপহার পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমানগণ সে চিকিৎসককে কোন কাজে লাগাননি বরং এই বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন যে, অর্থাৎ, আমরা এমন জাতি যারা পচ- ক্ষুধা না লাগিয়ে খাই না। আর যখন খাই পেট বোঝাই করে খাই না। চিকিত্সা বিজ্ঞানের জনক ডা. হিপোক্রেটিস বহু শতাব্দী আগে বলেছেন, ঞযব সড়ৎব ুড়ঁ হড়ঁৎরংয ধ ফবংবধংবফ নড়ফু, ঃযব ড়িৎংব ুড়ঁ সধশব রঃ. অর্থাৎ, অসুস্থ দেহে যতই খাবার দেবে, ততই রোগ বাড়তে থাকবে।
সুপ্রিয় শ্রোতা, তীব্র ক্ষুধা লগিয়ে খাওয়া আর পেট বোঝাই না করে খাওয়া এর মাঝেই নিহিত আছে বিশ্বমানবের শারীরিক স্বাস্থ্যের যাবতীয় কল্যাণ।
এ ব্যক্তিগত বা শারীরিক কল্যাণ ছাড়াও পারিবারিক ও সামাজিকভাবে রোজা প্রভূত মানব কল্যাণ সাধন করে। আমাদের ব্যস্ত সংসারে অনেক এমন স্বামী- স্ত্রীও আছেন যে, সারা বছর এত ব্যস্ত যে, একসাথে খেতে বসার মত সুযোগটুকুও তাদের হয় না। কিন্তু রোজা পরিবারের সকল সদস্যকে এক সাথে ইফতার করতে বসিয়ে দেয়। এখানে পরে বসব, পরে খাব এমন কোন সুযোগ নেই। সামাজিক ভাবেও বিভিন্ন দ্বন্দ্ব, ফাসাদ, হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি কারণে যারা সারা বছর একে অপরকে এড়িয়ে চলতো; রমজান সেসব মানুষকে বিভন্ন উপলক্ষের আয়োজন করে একদম কাছে এনে দেয়। একসাথে ওঠা বসা খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি আনন্দ উৎফুল্লতার মাঝে সবাইকে মাতিয়ে রাখে রমজান । আর আনন্দ ও হাসি খুশী থাকাটাই সুস্থ থাকার পূর্বশর্ত। হাসি খুশী না থাকলে, দুঃখ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকলে মানুষের দেহে নেগেটিভ হরমন তৈরি হয়। যা মানব শরীরে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে, বার্ধক্য ডেকে আনে ও আয়ু কমিয়ে দেয়। রোজা এসব প্রতিরোধ করে মানব কল্যাণ সাধন করে থাকে।
পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় সম্প্রতী বৃদ্ধি করে রমজান। বিশ্বব্যাপী তাকওয়া ভিত্তিক উদার ভ্রাত্বের শিক্ষা দেয় রমজান। এর চেয়ে বৃহৎ মানব কল্যাণ আর কি থাকতে পারে। এ দিকে ইংগিত করেই আল্লাহ পাক বলেন- রোজার মাধ্যমে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে। সুরা বাকারা. আয়াত ১৮৩। মানবের সামগ্রিক কল্যাণে তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। তকওয়ার অধিকারী কিছু মুত্তাকী লোকের দ্বারই একটা পরিবার কল্যাণ ও শান্তিময় হতে পারে। সমাজের মানুষগুলো মুত্তাকী হলে পুরো সমাজটাই কল্যাণ ও শান্তিময় হতে পারে। অনুরূপ আন্তর্জাতিক পরিম-ল পর্যন্ত মানুষের সকল সমস্যা সমাধান করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব শুধু তাকওয়ার বদৌলতে। রোজার মূল শিক্ষাই হচ্ছে তাকওয়া।
এ ছাড়াও রমজান শিক্ষা দেয় সময়ানুবর্তিতা বা ঝঃৎরপঃষু ঃরসব সধরহঃধরহরহম. যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আছে সাহরীতে ও ইফাতারিতে। কাঁটায় কাঁটায় এ রকম সময় মেনে চলার বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় কোন উদাহরণ কোথাও নেই। রমজান শিক্ষা দেয় পরম ধৈর্যের অনুশীলন করতে, লোভ সংবরণ করতে। নফসের সাথে জিহাদ করার শক্তি যোগাও রোজা। আল্লাহর হুকুম পালনে জন্য রোজা একটা মানুষকে মানসিকভাবে তৈরি করে দেয়। ইবাদাত ও সাহরীর জন্য গভীর রাতের ঘুম থেকে সবাইকে জাগিয়ে দেয় রোজা। কম ঘুমানো ও বেশী ইবাদতের শিক্ষা আমরা রমজানেই লাভ করি।
সর্বোপরি মানুষ আমরা নানা ধরনের অন্যায় অপকর্মে জড়িয়ে দিন দিন জাহান্নামের দিকে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছি। আর রমজান এসেছে পৃথিবীর মানুষকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে, নাজাত দিতে। সুনানু নাসায়ী এর ২২১০ নং হাদীসে ইরশাদ হচ্ছে –
‘যে ব্যক্তি ইমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় রজমানের রোজা রাখল, রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলো, সে তার গুনাহ থেকে সেরূপ বেরিয়ে যাবে, যেদিন তার মা তাকে নিষ্পাপ রূপে ভূমিষ্ঠ করেছিলেন।’ সুতরাং রমজান বিশ্ব মানবের কল্যাণে এই আহ্বান করে যায়- হে বিশ্বমানব,ইমান আনো, রোজা পালন করো, নাজাত নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করো। আমরা সকলে যেন মানব কল্যাণে রমজানের এ আহ্বান ও শিক্ষা কাজে লাগাতে পারি সে তাওফীক পরম করুণাময়ে দরবারে প্রার্থনা করে শেষ করছি আমীনৃৃ
