লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি ডেমরায় অদক্ষ্য ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে যাত্রীবাহী লেগুনা
মাহবুব মনি: ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে যাত্রীবাহী লেগুনা। দিনে দিনে তারা যেন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ঘটছে মর্মান্তিক সব সড়ক দূর্ঘটনা। প্রাণহানী রোধ করা যাচ্ছেনা কিছুতেই। বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। আতংকে রয়েছে এসব অবৈধ যানবাহনের যাত্রীরা। বেশিরভাগ লেগুনার ফিটনেস-রেজিষ্ট্রেশন নেই। চালকদের নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। আর অধিকাংশ চালক অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক। পাশাপশি বেশিরভাগ চালক মাদকাসক্ত। এদের বিরুদ্ধে ট্রাফিক বিভাগসহ প্রশাসন কোন প্রকার ব্যবস্থা নিতে পারছেনা। এক্ষেত্রে তারা নির্বিকার বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। একটি কুচক্রি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় সংশ্লিষ্ট দরবারগুলো ম্যানেজ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রতিনিয়ত দাপটের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল করছে সাড়ে ৩ শতাধিক লেগুনা। আর এ অবৈধ যানবাহনকে ঘিরে চলছে লক্ষ লক্ষ টাকার চাঁদাবাজি। দেখার যেন কেউ নেই।খবর যুগান্তর
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এলাকা ভেদে চলাচলকারী এসব ঘাতক অবৈধ যাত্রীবাহী লেগুনা সরকার দলীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাসিক ও দৈনিক চাঁদার ভিত্তিতে সড়কে চলাচল করছে। আর লেগুনা চালকদের বেপরোয়াপনায় ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। রাজধানীর অভ্যন্তরে সত্বেও অপ্রাপ্ত বয়স্ক লাইসেন্সবিহীন চালকের মাধ্যমে ডেমরায় নির্বিঘেœ চলছে অবৈধ যাত্রীবাহী লেগুনা। কিন্তু এত কিছুর পরেও অজ্ঞাত কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এসব অবৈধ যানবাহনের অবাধ চলাচল বন্ধ হচ্ছেনা। সূত্র জানায়, ডেমরা থেকে যাত্রাবাড়ী, যাত্রাবাড়ী থেকে কোনাপাড়া-ডগাইর বড়ভাঙ্গা, যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জ রূগঞ্জের বরপা, যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাংরোডসহ কয়েকটি এলাকা ভেদে চলছে অবৈধ যাত্রীবাহী লেগুনা। এদিকে ডেমরার ষ্টাফ কোয়ার্টার থেকে রামপুরা-রূপগঞ্জের পূর্বগ্রাম পর্যন্তও কিছু লেগুনা অবাধে চলাচল করছে। আর দৈনিক ও মাসিক হারে চাদার ভিত্তিতেই ঢাকা- সিলেট মহাসড়কে চলছে এসব লেগুনা। প্রতিদিন মালিক সমিতির নামে চাদা লেগুনা প্রতি চাদা তোলা হয় ১শ’ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ১১০টাকা, লাইনম্যান ৫০ টাকা। এছাড়াও রুট ভেদে অতিরিক্ত ১শ’টাকা দিতে হয় চালকদের। আর যেসব লেগুনা পুলিশ ডিউটি করতে ইচ্ছুক নয় সেসব লেগুনার বেলায় প্রতিদিনের চাদা ব্যতীত মাসিক ১ হাজার টাকা দিতে হয় সিন্ডিকেটকে। আর বেশির ভাগ লেগুনাই এ শর্ত মেনে নেয় কারণ পুলিশ ডিউটিতে নাকি লোকসান বেশি। এদিকে সড়কে পুলিশি ঝামেলা এড়াতে লাইসেন্সবিহীন এসব লেগুনা চালকদের আবার বছর ভিত্তিক কার্ড দেওয়া হয়। চালককে ২ হাজার ৬শ’ টাকা পরিশোধ করতে হয় এক বছর মেয়াদি অনুমোদন কার্ডের জন্য। এ টাকা প্রশাসন ও সিন্ডিকেট ভাগ করে নেয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। আর এ সুযোগে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালকেরা। নিয়মিত টহল কার্যক্রম ও নিরাপত্তপমূলক পুলিশ চেকপোষ্ট থাকা সত্বেও বাধাহীনভাবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবৈধ লেগুনা চালাতে পারছে চালকেরা।
সূত্রে আরও জানা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কে চলাচলকৃত এসব অবৈধ লেগুনার চাদাবাজির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছেন যাত্রাবাড়ী থানা শ্রমিক লীগ ও লেগুনা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক বাচ্চু খন্দকার। সামান্য ঢেলাগাড়ির চালক থেকে তিনি আজ স্বনামধন্য কোটিপতি। রাজধানীর মাতুয়াইলে রয়েছে তার আলীসান ফ্ল্যাট বাড়ি। প্রশাসনসহ সব প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে অবৈধ লেগুনার ব্যবসাসহ চাদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা তার কাছে তুরির ব্যাপার। তবে চাদাবাজির বিষয়টি অস্বীকার করে বাচ্চু খন্দকার মুঠোফোনে বলেন, ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কের বিষয়টি শ্রমিক ইউনিয়ন দেখে। রূপগঞ্জের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে ওখানকার লোকজন। আর প্রশাসনকে ম্যানেজ করার বিষয়টি আমার নয়। তবে মালিক সমিতি প্রশাসনকে ম্যানেজের বিষয়ে যদি কোন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে সে বিষয়ে আমি অবগত নই। তিনি যুগান্তরকে আরও বলেন, অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিনিয়ত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে রেজিষ্ট্রেশনবিহীন লেগুনাও এ সড়ক থেকে উঠে যাবে। আর মাসিক ১ হাজার টাকা করে চাঁদা গত দু’মাস ধরে আমার নিজের উদ্যোগে বন্ধ করে করা হয়েছে। তবে যাত্রাবাড়ী থেকে কোনাপাড়া পর্যন্ত ৫ টাকা ভাড়া এদেশের কোথাও এমনটি নেই। ওইসব মাইক্রোকাটা লেগুনা আছে বলেই এত কম ভাড়ায় এখানকার যাত্রীরা চলাচল করতে পারছেন। অবশ্য এ বিষয়ে যাত্রী সাধারণের কোন অভিযোগ নেই। তারা জেনে শুনেই এ সড়কে চলাচল করছেন। আর ব্যাংক থেকে কিস্তিতে নতুন একটি লেগুনা সড়কে নামানো পর্যন্ত সব খরচ মিলিয়ে ৫ লাখ টাকা খরচ হয়। আর মাসিক কিস্তি ২২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে ১১ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয় মালিকদের। এত বেশি পুঁজি খাটিয়ে এত কম ভাড়ায় লেগুনার ব্যবসায় কেউ নামতে চায়না। তবে পর্যায়ক্রমে বৈধ নতুন গাড়ি এ সড়কে নামছে। আর অধিকাংশ সড়ক দূর্ঘটনা যাত্রীদের অসাবধানতা থেকেই হয় বলেও জানায় বাচ্চু খন্দকার।
দেখা গেছে গত ৩১ মার্চ ফেরদৌসি বেগম (৬৫) নামে এক বৃদ্ধার সকাল সোয়া ৯ টায় ডেমরার বাঁশেরপুল বাসস্ট্যান্ডে একটি যাত্রীবাহী লেগুনার ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বড় মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে লেগুনা নেমে রাস্তা পার হওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। এর আগে ২৫ মার্চ দুপুরে একই এলাকায় মারিয়া আক্তার নামে ৯ বছরের একটি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। অপর একটি লেগুনার ধাক্কায় খালার কোল থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হয়। শহর থেকে অসুস্থ্য মেয়েটিকে ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় ফেরার পথে এ ঘটনা। এ ঘটনার কয়েকদিন আগে ষ্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় লেগুনার ধাক্কায় এক কলেজছাত্রী কোমরে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়। গত ২ মাস আগে ষ্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় লেগুনার ধাক্কায় আব্বাস মিয়া (৩৫) নামে এক ব্যবসায়ীর ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। এভাবে গত ৪ বছরে ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কে লেগুনার ধাক্কায় অর্ধ শতাধিক প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে। আরও দেড় শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আর প্রায় প্রতিদিনই এ সড়কে লেগুনা সংশ্লিষ্ট নানা রকম অপ্রিতীকর ঘটনা ঘটে থাকে বলে অভিযোগ যাত্রীসাধারণের।
ঝুঁকিপূর্ণ এ যানবাহনের বিষয়ে জানতে চাইলে লেগুনার যাত্রী সৈয়দ আশরাফ হোসেন বলেন, ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কে গণ পরিবহন কম থাকায় এবং দ্রুত চলাচলের জন্য লেগুনাতেই চলতে হয় তাদের। আর এখানকার লোকাল বাসে গেলে অনেক সময় লেগে যায়। যথাসময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানো যায়না।
এ সড়কে চলাচলকারী মোটর সাইকেল চালক নূর আলম ভূইয়া বলেন, রাস্তায় যাত্রীবাহী লেগুনার দৌরাতেœ্য চলা দায়। যে কোন সময় এড়া পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। ডেমরায় এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। ফলে মোটর সাইকেল চালকেরা চরম হতাশায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
আরেক মোটর সাইকেল চালক আফজাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রাস্তায় চেকপোষ্টে পুলিশ আমাদের লাইসেন্স, হ্যালমেটসহ নানা কারণে চেক করে থাকে। কিন্তু অবৈধ যাত্রীবাহী লেগুনার বেলায় কোন প্রকার চেক করা হয়না। এটা খুবই দু:খজনক ব্যাপার। তবে এ সড়কে এত পুলিশি তৎপরতা সত্বেও ফিটনেস ও রেজিষ্ট্রেশনবিহীন গাড়ি কিভাবে চলছে। এ বিষয়টি বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।
লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিষয়ে একাধিক অপ্রাপ্ত বয়স্ক লেগুনা চালক যুগান্তরকে বলেন, লাইসেন্স করার বিষয়টি অনেক জটিল হওয়ায় তারা লাইসেন্স করতে পারছেনা। আর কোন ঝামেলা হলে মালিকরা কোননা কোনভাবে সুরাহা করেন। লাইসেন্স করতে গেলেও অনেক টাকা আর বিরম্বনা। ৬ মাসের বেশি সময় লেগে যায়। তারা গরিব মানুষ বলে এত ঝামেলা পোহাতে চায়না। আর পেটের দায়ে তারা এ বয়সে লেগুনা চলানোর কাজ করে বলেও জানায় চালকেরা।
এ বিষয়ে ডেমরা থানার অপারেশন অফিসার ¯েœহাশীষ বলেন, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবে ডেমরা-যাত্রাবাড়ী সড়কে অবৈধ যাত্রীবাহী লেগুনা চলছে। নানা প্রতিবন্ধকতায় তবে যাত্রীরা জেনে শুনেই এসব যানবাহনে চলাচল করে থাকে। এক্ষেত্রে যাত্রীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আর রাস্তার বিষয়টি ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রামপুরা ট্রাফিক জোনের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) বলেন, গণপরিবহন সংকট, অদক্ষ চালক স্বল্পতা এবং লাইসেন্স তৈরীতে বিরম্বনা থাকায় লেগুনার মালিকেরা এসব চালক দিয়ে লেগুনা চালাচ্ছে। আর জনসাধারনের সহজ চলাচলের স্বার্থে অনেক সময় লেগুনার বিষয়ে আমরা এড়িয়ে চললেও বেশিরভাগ সময় অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালকের বেলায় আমরা ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় ব্যবস্থা নিতে গেলে যাত্রীরাও আমাদের সঙ্গে ঝামেলা পাকায়। তবে এসব অবৈধ যানবাহনের বিষয়ে আমাদের অভিযান প্রতিনিয়ত অব্যাহত রয়েছে। সুত্র যুগান্তর
